উত্তাল মধ্যপ্রাচ্য আর দিল্লির চাপ, বড় পরীক্ষায় বাংলাদেশের কূটনীতি: নিউ ইয়র্ক না বেইজিং, কার পাল্লা ভারী?

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র দেড় মাসের মাথায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন। একদিকে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ঘিরে বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণ, অন্যদিকে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা—সব মিলিয়ে ঢাকার সাউথ ব্লকে এখন সাজ সাজ রব। বিশেষ করে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লেখা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল নিয়ে আলোচনার পর প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশ কি তবে পুরোপুরি ওয়াশিংটন ঘেঁষা হয়ে পড়ছে?

আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক ছিল প্রশ্নাতীতভাবে ঘনিষ্ঠ। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর সেই রসায়নে ভাটা পড়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, বিএনপি সরকার তা কীভাবে সামাল দেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। যদিও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম স্পষ্ট জানিয়েছেন, বাংলাদেশের নীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশকেন্দ্রিক নয়। তিনি বলেন, “আমাদের অগ্রাধিকার হলো বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ। কে নাখোশ হলো তা আমাদের কাছে বড় নয়।”

ইরান ইস্যু ও কূটনীতির মারপ্যাঁচ মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে বেশ বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইরানের হামলার নিন্দা জানালেও মার্কিন হামলার বিষয়ে নীরব থাকা নিয়ে খোদ তেহরান অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। ঢাকায় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বিবৃতি আরও স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার নতুন হওয়ায় তাদের কিছুটা ‘গ্রেস পিরিয়ড’ দেওয়া প্রয়োজন। এরই মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রস্তুতি বাংলাদেশের ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’-এরই অংশ।

তিস্তা ও ট্রাম্পের চিঠি: লিটমাস টেস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিনের মতে, ভারত ও চীনের মধ্যকার রেষারেষিতে তিস্তা প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য ‘লিটমাস টেস্ট’। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই প্রকল্প নিয়ে দিল্লি ও বেইজিং উভয়েরই আগ্রহ রয়েছে। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চিঠিতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়টি সামনে আসায় চীন কিছুটা উদ্বিগ্ন হতে পারে। কারণ, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চীনের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে, আবার রপ্তানি বাজারের বড় অংশ জুড়ে আছে আমেরিকা ও ইউরোপ।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর সতর্ক করে বলেন, “নিরাপত্তার জন্য আমাদের ভারতের সাথে কাজ করতে হবে, আবার কাঁচামালের জন্য চীন ও বাজারের জন্য আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল থাকতে হবে। এখানে কাউকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।” অর্থাৎ, একপক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়া মানেই অন্য পক্ষকে হারানো, যা বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট শক্তির তল্পিবাহক হবে নাকি ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব’ বজায় রেখে নিজস্ব স্বার্থ আদায় করতে পারবে, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। শামা ওবায়েদের ভাষায়, “জনগণের স্বার্থই শেষ কথা।” তবে বিশ্ব রাজনীতির এই দাবার চালে ক্ষুদ্র শক্তির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কতটা ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে, তা সময়ই বলে দেবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *